বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিগুলোর মধ্যে প্রযুক্তি ও উপকরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ চেষ্টা নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে দুষ্প্রাপ্য খনিজ এখন বাণিজ্যিক মেরুকরণ ও প্রতিপক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হয়ে উঠছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি বেশ আলোচনায় এসেছে চীনের নতুন রফতানি নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা। এর অধীনে কিছু দুষ্প্রাপ্য খনিজের চালান নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। বিধিমালাটির কারণে দুষ্প্রাপ্য খনিজের বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটাতে পারে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। খবর এফটি।
গত মাসের শুরুতে চীন সরকার সাতটি দুষ্প্রাপ্য খনিজ এবং সেগুলো দিয়ে তৈরি পার্মানেন্ট ম্যাগনেটের ওপর রফতানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর মধ্যে রয়েছে নিওডিয়ামিয়াম, প্রাসিওডিয়ামিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, টার্বিয়াম, সামারিয়াম, গাডোলিনিয়াম ও হলমিয়াম। এ খনিজগুলো বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি, উইন্ড টারবাইন, হিউম্যানয়েড রোবট ও যুদ্ধবিমানসহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহার হয়।
চীনে অবস্থানরত রফতানিকারক, শিল্পসংক্রান্ত পক্ষগুলো ও সরবরাহ চেইন বিশেষজ্ঞরা জানান, আবেদনের পর কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করিয়ে বেইজিংয়ের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইউরোপে রফতানির জন্য কিছু লাইসেন্স অনুমোদন করেছে। অনুমোদনের এ গতি তাদের চাহিদার জন্য যথেষ্ট নয়। ফেডারেশন অব জার্মান ইন্ডাস্ট্রিজের (বিডিআই) বোর্ড সদস্য ওলফগ্যাং নিডারমার্ক জানান, এখনই কোনো ব্যবস্থা না নিলে ইউরোপে উৎপাদন আটকে যাবে। এতে কোম্পানিগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।
এর আগে টেসলা, ফোর্ড ও লকহিড মার্টিনের মতো মার্কিন অটো ও এভিয়েশন জায়ান্টরা চীনা রফতানি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলোন মাস্ক গত মাসে বিনিয়োগকারীদের জানান, টেসলার রোবট বাহুতে ব্যবহৃত খনিজ ম্যাগনেটগুলো সামরিক উদ্দেশে ব্যবহার হবে না, এমন নিশ্চয়তা চেয়েছে চীন। তবে এ চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে আত্মবিশ্বাসী তিনি।
চীনে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউরোপীয় শিল্প নির্বাহী জানান, বেইজিংয়ে নীতিমালা প্রয়োগে বড় ধরনের গাফিলতি রয়েছে। চীনা কর্মকর্তারা বুঝতে পারেনি এ নিষেধাজ্ঞা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে এবং প্রায়োগিক ক্ষেত্র কী ধরনের প্রস্তুতির দরকার। ফলে এখন বিদেশী কোম্পানিগুলো সমস্যায় পড়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২ এপ্রিল চীনের ওপর ব্যাপক আকারে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ ঘোষণা করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় দুষ্প্রাপ্য খনিজ রফতানির ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয় বেইজিং। ফলে রফতানিকারকদের চীনা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সাতটি নির্দিষ্ট দুষ্প্রাপ্য খনিজ এবং সেগুলো দিয়ে তৈরি পার্মানেন্ট ম্যাগনেট রফতানির অনুমতি নিতে হবে। এ পদক্ষেপে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে যে ব্যাঘাতের আশঙ্কা তৈরি তা গোটা চেইনে চীনের একচেটিয়া প্রভাব এবং কৌশলগত গুরুত্বকে প্রতিফলিত করে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চীনের পূর্ব শানডং প্রদেশভিত্তিক রফতানিকারক ইয়ানতাই ঝেংহাই ম্যাগনেটিক ম্যাটেরিয়াল জানিয়েছে, তারা রফতানি লাইসেন্স পেয়েছে এবং কিছু গ্রাহকের কাছ থেকে পুনরায় ক্রয়াদেশ নেয়া শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জার্মান গাড়ি নির্মাতা ভক্সওয়াগনের জন্য অন্তত একটি চালান অনুমোদন পেয়েছে। কোম্পানিটি বলছে, দুষ্প্রাপ্য খনিজ উপাদানসমৃদ্ধ যন্ত্রাংশ সরবরাহ স্থিতিশীল রয়েছে এবং সরবরাহকারীরা ‘এ ধরনের রফতানি লাইসেন্সের সীমিত সংখ্যক অনুমোদন’ পেয়েছে।
দুষ্প্রাপ্য খনিজনির্ভর শিল্পগুলোয় আশঙ্কা রয়েছে, লাইসেন্সের আবেদন বেড়ে যাওয়ায় চীনা আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা চাপে পড়তে পারে, যা অনুমোদনের গতি আরো ধীর করে দিতে পারে। এছাড়া অনুমোদনের শর্ত পূরণ নিয়ে জটিলতা রয়েছে। ওপরে উল্লেখিত ইউরোপীয় কোম্পানি নির্বাহী বলেন, ‘চীনা খনিজ যুক্তরাষ্ট্রে পুনঃরফতানি করলে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন হবে। কিন্তু ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো নিশ্চিত নয় কীভাবে তারা এটি প্রমাণ করবে।’
রফতানির আগে চীন জানতে চাইছে, যেসব দেশ বা কোম্পানি তাদের কাছ থেকে বিরল খনিজ বা ম্যাগনেট নিচ্ছে, তারা সেগুলো কী কাজে ব্যবহার করবে। বিশেষ করে ‘সামরিক কাজে ব্যবহার হবে না’ এ নিশ্চয়তা চাইছে। ভারতীয় কনগ্লোমারেট মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রার অটো ইউনিটের প্রধান নির্বাহী রাজেশ জেজুরিকারের মতে, চূড়ান্ত ব্যবহারের প্রমাণপত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া এখনো পরিষ্কার নয়।
পার্মানেন্ট ম্যাগনেট বিক্রেতা চেংদু গ্যালাক্সি ম্যাগনেটসের এক ব্যবস্থাপক জানান, মূলত সামরিকসংশ্লিষ্ট চালান নিয়েই চীনের উদ্বেগ।
লকহিডের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানে পার্মানেন্ট ম্যাগনেট ব্যবহার হয়। নতুন নিয়ন্ত্রণগুলো এ শিল্পে স্বল্পমেয়াদে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ চেইনে পরিবর্তন আনতে পারে। কোম্পানির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা ইভান স্কট জানান, তাদের কাছে চলতি বছরের জন্য পর্যাপ্ত দুষ্প্রাপ্য খনিজ মজুদ আছে। এখন আশা করছেন, মার্কিন কর্তৃপক্ষ লকহিডের মতো সংবেদনশীল কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেবে।
বেইজিংভিত্তিক পরামর্শক সংস্থা ট্রিভিয়াম চায়নার সহযোগী পরিচালক কোরি কমস বলেন, ‘এমন কোনো প্রমাণ নেই যে চীন সবাইকে রফতানি থেকে একেবারে বাদ দিয়েছে।’
তার মতে, চীনের এ নিয়ন্ত্রণ নীতির প্রধান লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষি। কোরি কমসের ভাষ্যে, চীন অনুমোদনের ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্টতা বজায় রাখছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে চায়। মার্কিন প্রতিপক্ষকে বুঝিয়ে দিতে চায়, ‘যদি সন্তোষজনক চুক্তি না করো, তাহলে আমরা রফতানি বন্ধ করে দিতে পারি।’